সম্পাদকীয় : বিজ্ঞানচেতনা

গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থায় রাষ্ট্র সকল মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা; অনিয়ম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ কিংবা সকল ধরনের কর্তৃত্বের বিপরীতে ক্ষোভ প্রকাশের অধিকারকে নিশ্চিত করে। খাওয়া, পরা, থাকাসহ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সার্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের স্বীকৃত দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় এসব দায়িত্ব কিংবা অধিকার প্রশ্নে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ যতবেশি বিস্তৃত ও গভীর হয়, রাষ্ট্র ততই গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনায় সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান আর্থ-সামাজিক-রাজনীতিক পরিসরে ব্যাপকতর জনগণের প্রতিনিধিত্ব ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। সেখানে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় অগণতান্ত্রিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুবিধা ও ক্ষমতাভোগী ভাবনা প্রসারিত হচ্ছে, প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে গোষ্ঠীগত ক্ষমতা আর বিশেষ শ্রেণী-পেশার মানুষের আধিপত্য। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় যে কোনো তৎপরতা তা সন্ত্রাস নির্মূল কিংবা নিরাপত্তার প্রশ্ন হোক, আর জাতীয় উন্নয়নের নামে কোনো জাতীয় পরিকল্পনা হোক, তাকে ভালো মন্দের বিতর্কের মধ্যে ফেললে তা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট শ্রেণীর গড়ে ওঠা ভাবনা, মতাদর্শ, সংস্কার, লক্ষ্য, সংকট-সৃষ্টি এবং সংকট-মুক্তির পরিকল্পনা সমস্তই ব্যক্তি সমাজ ও সমষ্টির সম্মতি আদায়ের অন্যতম টুলস্ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিতে দেশব্যাপী সন্ত্রাস নির্মূলের নামে যে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা অব্যাহত তা স্বার্থসংশ্লিষ্ট শ্রেণির ক্ষমতাকে আরো স্থায়িত্ব দান করবে।

এরকম পরিস্থিতিতে ব্যক্তি-মানুষ আসলেই কি নিরাপদ? রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নির্যাতনের বিস্তৃত পরিকল্পনায় একজন নিরপরাধ ব্যক্তি-মানুষের খুব সহজেই অপরাধীর তালিকাভূক্তির সম্ভাবনাকে কি উড়িয়ে দেয়া যায়? যেখানে শিক্ষক রাজনীতিবিদ হত্যাসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক একের পর এক সহিংসতার নজির সৃষ্টি হচ্ছে সেখানে এই রাষ্ট্র ব্যক্তিমানুষের অধিকারকে কিভাবে নিশ্চিত করবে? ব্যক্তিমানুষের অধিকারকেই বা আমরা কিভাবে দেখব? এরকম নৈরাজ্যিক অস্থিরতাতে মানুষের সার্বিক মুক্তির পথ কী? ব্যক্তি কি শুধুই ব্যক্তিমানুষের অধিকারের দাবি নিয়ে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, না কি ব্যক্তির অধিকারকে সচেতন জনগোষ্ঠীর অধিকার হিসেবেই দেখবে? এসব প্রশ্নের মীমাংসা নির্দিষ্ট কোনো ছকের মধ্যে অনুসন্ধান না করে ব্যাপকতর জনগোষ্ঠী যাতে নিজেরাই এই সংকটের মীমাংসা করতে পারে তার জন্য সমাজ সংগঠনের যাবতীয় তথ্য-উপাত্তে অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করাই সমাজ রূপান্তরের কাজের অন্যতম দায়িত্ব হতে পারে।

বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। অসংখ্য নদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে এদেশের বুকের উপর। নদীর পলিতেই এদেশের জন্ম। এরকম ভূপ্রাকৃতিক ব্যবস্থায় আমাদের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম হতে পারতো নদী। কিন্তু দিনে দিনে সেই জন্ম জননী নদী শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হয়ে আসছে। উন্নয়ন আধিপত্যে শুধু আমাদের নদী নয়, পৃথিবীব্যাপী নদী তথা পানি ব্যবস্থাপনা আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। বাংলাদেশসহ পৃথিবীব্যাপী পানি ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে প্রকৃতি ও মানুষের বিরোধী নির্দিষ্ট শ্রেণী-পেশা মানুষের স্বার্থরক্ষাকারী পরিকল্পনা। কিন্তু এসব পরিকল্পনায় খেসারত দিতে হয় সেই সব মানুষকে, যাদের জীবিকা ঐসব প্রকল্পের সাথে জড়িত; খেসারত দিতে হয় বন্যা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা, মরুকরণ—এসবের মধ্য দিয়ে। অথচ ঐ প্রকল্প নির্মাণের যে প্রক্রিয়া তার কোথাও এসব মানুষের কোনোরকম অংশগ্রহণ থাকে না। আমরা মনে করি পানি ব্যবস্থাপনাসহ যেকোনো ধরনের প্রকল্পে, যার ফলাফল সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার সাথে সংশ্লিষ্ট, তার পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন এসব ভুক্তভোগী মানুষের অংশগ্রহণেই হওয়া উচিত।

You Might Also Like

Comments

Leave A Comment

Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Get Newsletter

Featured News

Advertisement

Voting Poll (Checkbox)

Voting Poll (Radio)

Readers Opinion

Editors Choice